স্বামী স্ত্রী
সপ্তাহ ঘুরে । সাতদিনের কোটা পার করে আমরা এখন অষ্টম দিনের স্বামী স্ত্রী । একটা মানুষকে জানতে নাকি মাত্র কয়েকটা মুহূর্তই প্রয়োজন হয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতে হয় না। আমি বেশি স্বপ্ন দেখেছিলাম তো, তাই ২৪ পূরণ ৭ ঘণ্টা পরেও আমি আমার পাশের মানুষটাকে চিনতে পারিনি । এত সুন্দর , ভদ্র আর কিউট একটা ছেলে , আমি সবসময় চেয়েছিলাম , ঠিক তেমন একটা ছেলেই আমার চারপাশে ঘুরাফেরা করে , আশ্চর্য , আমি তাকে চিনতে পারি না । কেন আমি পড়তে পারিনা একে , কেন আমার অপেক্ষাগুলো শেষ হয় না!! আমার খুব প্রিয় আকাশ দেখা । বেশি ভাবুক তো, উদাসীনের সব লক্ষণ একেবারে কায়দা করে রপ্ত করেছি । আমাদের বিশাল রুমটার সাথেই একটা ছোট খোলা বারান্দা আছে, দখিনে মুখ তার । আমার ভীষণ প্রিয় জায়গাটা । সারাটা দিন এখানে সেখানে মানুষের পদধূলি নিতে নিতে জান যায় , তাই দিনে এখানে আসা হয় না । কিন্তু রাতটা শুধুই আমার । অভ্র ঘুমিয়ে পড়ে । তারপর এসে বসি এখানটায় । আকাশের সাথে কথা বলি । তারাগুলো আমার বন্ধু । বিচার চাই তাদের কাছে । আমার স্বপ্নগুলোতো ওরাই তৈরি করে দিল । মুক্ত আকাশের নিচে ভালবাসাবাসি করার স্বপ্নটা কি আমার পূরণ হবে না! এলো বাতাসকে বলি , আমাকে গল্প শুনিয়ে যাও , আমার জীবনটা এমন হল কেন? আফসোস , আজ সবাই নিশ্চুপ । কারো কাছে কোন শব্দ নেই ...... অভ্রের সাথে যখন গাড়িতে বসে থাকি , খুব ইচ্ছা করে ওর হাতটা একটু ধরি । গিয়ারে ধরা ওর হাতটা একটু কেঁপে যাক । সামনের কাঁচটা একটু ঝাপসা হয়ে যাক । একটু গাড়িটা নেচে উঠুক । আমিও নেচে উঠি সেই সাথে , আনন্দে । কিছুই হয়না । ও সামনেই তাকিয়ে থাকে , রাস্তায় খুব মনোযোগ । আমিও গাড়িগুণার চেষ্টা করি , এক দুই তিন ............ দখিনের বারান্দাটায় একটা ছোট্ট গোলাপ গাছ আছে । কেউ দেখে না । অযত্নে অবহেলায় সে দিন গুজরান করে । বেচারা একটু পানিটুকুও পায় না । তাতে কি , প্রকৃতি তার সন্তানদের নিজ দায়িত্বে রাখে । অযত্নে বেড়ে উঠা সেই গাছটিতে একটা লাল টকটকে ফুল ফুটেছে দুইদিন হল । আমিও হেলায় এড়িয়ে যাই ওটাকে । থাকুক না । মাঝে মাঝে মনে হয় , অভ্র কি কখনো বুঝবে , ওই লাল ফুলটা ওর হাতে পাওয়ার আমার কত শখ ? কখনো কি বুঝবে , ওই লাল ছোট্ট সৃষ্টিটাও খুশি হবে , তুমি আমার হাতে দিলে! আজ কি হচ্ছে না হচ্ছে , কোনদিকে খেয়াল নেই । আপন মনেই বাসার এমাথা থেকে ওমাথা ঘুরে বেড়াচ্ছি । এটা সেটা নাড়াচাড়া করছি, বাবা মায়ের সাথে কথা বলছি, নানা রকম কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখার একটা ক্ষুদ্র এবং ব্যর্থ চেষ্টা । ছাইপাশ যা ইচ্ছা তাই করে আমি মনোযোগ অন্য দিকে ঘুরাচ্ছি । আমি অভ্রের প্রেমে পড়ছি...... একটু একটু করে......... শামুকের চেয়েও ধীর গতিতে ......... রুমে চলে আসলাম ।কাবার্ড গুছাবো । বিয়ের পর এইদিকে একদম মনোযোগ দেয়া হয়নি । যাচ্ছেতাই অবস্থা এখন । এলোমেলো সব জিনিসপত্র , আমারই মত । একটা একটা করে গুছাচ্ছি । হঠাতই ,একটা কাল ডাইরি পেলাম । অবশ্যই অভ্রের । এটা অভ্রের রুম । হাত নিশপিশ করছে ওটা খুলতে । কিন্তু এটা অভ্রের । আমার বর হলেও ও এখনো অন্য মানুষ । ওর সব জায়গায় প্রবেশাধিকার আমি পাইনি । বলতে বলতেই খুলে ফেললাম । আমার নিশ্বাস আটকে আসছে , আমি জানিনা ওতে কি লেখা আছে , এমন কিছু কি , যা আমি কখনো শুনতে চাইনা ? মিথিলা , আজকে তোমাকে প্রথম দেখলাম । প্রথম । কিন্তু আমার মনে হল , তোমাকে আমি যে আরও কতবার দেখেছি । ছবিতে দেখে বুঝতে পারিনি , জলজ্যান্ত দেখে বুঝলাম আজ । মানুষ সুন্দরের পূজারী , আমিই বা আলাদা হব কেন? তোমাকে গুটি গুটি পায়ে মাথায় ঘোমটা দিয়ে যখন আসতে দেখলাম , আমার জগত থমকে গিয়েছিল । বিশ্বাস করো মিথিলা , কখনো কাউকে দেখে এমনটা মনে হয় নি আমার । তোমাকে ওই এক নজর দেখায় আমি জানতাম , তোমাকেই দরকার আমার । আজব ব্যাপার জান , আমি জানি , তুমি যখন আসবে , আমি কখনোই তোমাকে বলতে পারব না , তোমাকে ভালবাসি । আমি এমনই মিথিলা । লিখে তো যাচ্ছি মিথিলা , মুখের কথা আর ফুটবে না, বুকের কথা বুকেই রয়ে যাবে । মাকে জানিয়ে দিয়েছি , তোমাকে পাশে পেতে চাই , তোমরাও নাকি জানিয়েছ । কিন্তু , আমাকে একটু সহজ করে নিও । আমি যে পারিনা কিছু । এই লেখাটা তোমাকে পড়তে দিব । নাহ...... সেটাও পারব না । পাতার পর পাতা লিখে যাওয়া। অজস্র শব্দ, অসংখ্য আবেগ , অফুরন্ত কথা । পড়তে পারছিনা আমি , আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। একটা সিদ্ধান্ত নিলাম । সব গল্পে নাহয় রাজপুত্র আসে, আজকে রাজকন্যা আসবে , রাজপুত্রকে নিয়ে যেতে । আমি সেই রাজকন্যা হব । সন্ধ্যা হয় হয় এমন একটা সময় । নির্মল । একটা খুব ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে , আস্তে আস্তে । আমাদের রুমের পর্দাগুলো সেই হাওয়ায় উড়ে বেড়াচ্ছে । ১০১ টা মোম জ্বালিয়েছি । ভয়ে আছি, যেই অকর্মার ঢেঁকি আমি , কখন না আগুন ধরিয়ে দি । তখন বাড়িসুদ্ধ মানুষসহ ফায়ার সার্ভিসের মানুষের সাথে প্রেম করতে হবে । তবুও... জ্বালালাম । আজকে আমার রাত । আজ কিছুই হবে না । তারারা আমাকে বলে গেছে । বাতাস গান গেয়ে শোনাচ্ছে । এবং সবকিছু চপেট করে দিয়ে বেকুব ছেলেটা হঠাৎ করেই এসে পড়লো । ওর এখন আসার কথা ছিল না । আজকেই সব কিছু বরবাদ করার জন্য হাঁদারামকে তাড়াতাড়ি আসতে হবে! আমি রুমের বাইরে ছিলাম । অভ্র রুমে দাঁড়িয়ে আছে । আমাকে দেখতে পাচ্ছে না । বেডসাইড টেবিলটায় আমি ওই গোলাপটা আর একটা কাগজের টুকরো রেখে দিয়েছি। ওকে দিতাম । ও নিজেই থেকেই দেখে ফেলেছে । চিরকুট পড়ছে অভ্র... তোমাকে সবসময় আমি কি বলে ভেবে এসেছি জানো? হাঁদারাম । এবং আমার ধারণা ১০০ শতাংশ সত্যি । ভালবাস , একটাবার বলা যায় না? ভালবাসার আমি যে কাঙাল , কেন বুঝ না ? এমনকি হাঁদা ছেলে , এটাও বুঝতে পারনি , আমি তোমার প্রেমে পড়ে গেছি। আমার শব্দ পেয়ে গেল অভ্র। পিছন দিকে খুব হুড়োহুড়ি করে ঘুরতে গেল , যেন খুব লজ্জা পেয়ে গেছে । একটু কি আমি দেখলাম , চোখটা একটু মোছার চেষ্টা করল ? কি জানি , আমার দেখার ভুল হবে হয়ত... এক সমুদ্রভরা ভালবাসা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে ও । বিধাতা আমার স্বপ্নগুলো ভেঙ্গে দেয় নি , হাঁদারাম তো আসলে ছিলাম আমি , এমন ভালবাসার সমুদ্র ফেলে আমি ছোট জলাধারে ছুটে গেছি , ভালবাসার হাহাকার করতে করতে । আমাকে উপযুক্ত শাস্তিই দেয়া হয়েছে । ভাল হয়েছে, খুব ভাল । আজকে ভোর দেখলাম দুজন ।পুবের আকাশটাকে রাঙ্গা করে সূয্যি মামা নতুন একটা দিনের ডাক দিচ্ছে । একটা নতুন সময়ের প্রতীক্ষায় সবাই জেগে উঠবে কিছুক্ষণ পরেই । আর আমার শুরু হবে একটা নতুন জীবন । ভালবাসাময় একটা জীবন। সকালটায়ও জেগে আছি । অভ্র ঘুমাচ্ছে আমার পাশে । সকালের মিষ্টি হলুদ রোদটা ওর উপর এসে পড়েছে । ভুরু কুঁচকাচ্ছে আমার রাজপুত্রটা । আমি দেখছি । সীমাহীন মায়ায় বুকটা ভরে যাচ্ছে আমার । ইসস.........এত মায়া যে কোথা থেকে আসে!



Comments
Post a Comment